বিজ্ঞান ভবন -২ আর বিজ্ঞান ভবন-৩ এর মাঝখানে আছে একটা কৃষ্ণচুড়ার গাছ তার চার পাশে আছে ইট সিমেন্ট বালুপাথর নির্মিত বসার জায়গা। এটা ছিল ইন্টারমিডিয়েট আর বিএসসি(অনার্স) ছাত্রছাত্রীদের মিলনায়তন। আমি তখন ঠাকুরগাঁও সরকারী কলেজের ছাত্র। আখতার স্যারের ক্লাস করব বলে কৃষ্ণচুড়ার নিচে বসেছিলাম। সেখানে একটি মেয়ে শুধু বসেছিল। মেঘলা আকাশের নিচে শুধু দুজন, আমাদের মুখে কোন কথা নেই। হঠাৎ আমি তাকে জিজ্ঞেস করে ফেলি "আপনি কিসে পড়েন?"
-বিএসসি(পাস) ফার্স্ট ইয়ার, তুমি?
-আমি দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছি। আপনার নামটা জানতে পারি?
-সুমি, আমার নাম সুমি। তোমার নাম?
-রনি, রনি আহমেদ।
-তুমি থাক কোথায়?
-বসিরপাড়ায়, আপনি?
-হাজিপাড়া, অনন্যা ছাত্রীনিবাসে।
এভাবে আরো অনেক কথা হয় সেদিন।
পরদিন যখন আমি কলেজের গেটে একটি চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম, বৃষ্টির জন্য ক্লাসে যেতে পারছিলাম না, ঠিক তখন-ই সুমি রিক্সা থেকে নেমে ছাতা হাতে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিল। আমি ডাকতেই সে আমাকে ছাতার মধ্যে টেনে নিল। কলেজ গেট থেকে বিজ্ঞান ভবন-২ পর্যন্ত পাঁচ মিনিট সময় লাগল আর ছাতাটা অনেক ছোট ছিল, তবুও প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে আমরা কেউ ভিজলাম না। আমি ধন্যবাদ দিইনি।কারন সে আমার খুব ভাল বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল।
জিলা স্কুল মাঠে ডিজিটাল মেলা হচ্ছিল। দুজনেই গেলাম আমরা। তার সাথে নাগরদোলা তে উঠতে মন চাচ্ছিল। আমি তাকে বললাম।সে নাগরদোলায় উঠতে প্রচুর ভয় পায়। কিন্তু আমার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে রাজি হয়ে গেল। নাগরদোলা ঘুরতে শুরু কর। সে তো ভয়ে এতটুকু হয়ে গেল আর আমার হাত টা শক্ত করে ধরে রাখল। আর আমি তো তখন হাওয়ায় হাওয়ায় উড়তেছি, আমার মনে তখন অন্যরকম অনুভুতি- বলে বোঝাতে পারবনা। নাগরদোলা থেকে নামার পর আমি তাকে বললাম- "সুমি, এ হাত কোনদিন ছিড়ে দেবে না তো?"
-আমাকে বিশ্বাস হয়না তোমার?
-হয়।
-তাহলে?
-আমি তোমাকে ভালবাসি,সুমি।
সুমির মুখে কথা থেমে যায়। তার চোখ অশ্রুতে চকচক করতে থাকে। বলে- আরো আগে বলনি কেন?
-ভয়।
-কিসের ভয়?
-এমনিতেই।
-বুঝেছি, আমাকে চিনতে তোমার তাহলে এত সময় লাগল।
-জানি না। "ভালবাসি বলবেনা"?
আশ্রমপাড়া শিশুপার্কে একটি দোলনাতে বসে আছি গল্প করছি দুজনে। সুমি বলল - এইচএসসি পরীক্ষার পর আমাকে ভুলে যাবে তাই না?
-এত ঠুনকো বিশ্বাস নিয়ে ভালবাসতে নেই, সুমি। তুমি আমার প্রথম ভালবাসা, তুমিই শেষ ভালবাসা। বিশ্বাস কর, তোমাকে আমি ভুলতে পারবনা। এই মরুভুমি হৃদয়ে তোমার জন্য ভালবাসার যে প্রাসাদ গড়েছি তা আমি ভাঙতে পারবনা - অন্তত এই বিশ্বাসটুকু রেখো।
পরীক্ষার পর রংপুর চলে আসি কোচিং করার জন্য। তার নিজস্ব কোন ফোন ছিলনা। তাই মন চাইলেই তার সাথে কথা বলতে পারতাম না। ফলে খুব একটা ভাল যোগাযোগ হত না। তারপর একসময় তার আর কোন খবর পেলাম না। সে নাই হয়ে গেল।
পরে আমি কলেজে তার বান্ধবীেদর সাথে দেখা করলাম। যা জানতে পারলাম তা হল-তার বিয়ে হয়ে গেছে। সে অন্য একজনের সাথে সুখের সংসার রচনা করছে।
আমার মন এটা মেনে নিতে পারেনি কোনদিনই। তবু আমার মন কে কষ্ট পেতে দিলামনা। বললাম - এটা ছিল একটা কানামাছি খেলা, যে খেলায় সুমি আমার জীবন থেকে কানামাছি খেলে ভোঁ দৌড় দিয়ে চলে গেছে। আর আমিতো চোখ বাঁধা-ই রয়ে গেছি।
এরপর, অনেকগুলো চাঁদনিরাত, অনেকগুলো শিশিরভেজা ভোর, অনেকগুলো বৃষ্টিময় দুপুর, স্নিগ্ধ বিকেল সুমিকে ছাড়াই কেটে গেছে। শুধু পাশে ছিল সুমির দেয়া স্মৃতিগুলো, যে স্মৃতি আজো আমার চোখের সামনে দিয়ে বিচরন করে, কিন্তু ধরতে পারিনা।