বসিরপাড়ার "তেরে নাম ছাত্রাবাস" আর "সোহাগ ছাত্রাবাস" পাশাপাশি হওয়ায় রাহাতের সাথে আমার নিয়মিত দেখা এবং আড্ডা দুটোই হত। আমরা দুটাই হলাম ভদ্র বান্দর, বলতে গেলে আবাল বান্দর। আড্ডার বিষয়বস্তু সাধারণত থাকত "প্রেম ভালবাসা" নিয়ে। আমি তখন একজন চলমান প্রেমিক। তাই রাহাত আমাকে দিয়ে কাজটা করাতে চাইল। আমাকে বলেই ফেলল- দোস্ত আমি একজনকে পছন্দ করে ফেলেছি।
-বলিস কি? মেয়েটা কে?
লাজুক স্বরে রাহাত বলল-অনু।
-অনু? অনুটা আবার কে?
-ভাব নিস আমার কাছে, অনুকে চিনিসনা? বেটা, বসের বাসায় একসাথে ফিজিক্স প্রাইভেট পড়িস, অনুকে চিনিসনা?
-না দোষ, অনু নামের কেউ আমাদের সাথে পড়েনা।
-আরে বেটা, তুই রিফাত, নাসিম, বরকত দের সাথে পড়িস না?
-হু পড়ি।
-কালো একটা বোরকা পড়ে। দেবিগন্জ বাড়ি।
-ওহ ইয়েস বুঝেছি, ঠিক করে নাম বলবি না? ওর তো আরো একটা নাম আছে (নামটা বললাম না)।
সময়টা তখন ২০১১ সাল। আমাদের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলতেছিল। এজন্য বন্ধুদের সাথে নিয়মিত দেখাও হত না, শুধু পরীক্ষার দিন ছাড়া। যাই হোক শুরুটা করতে হবে আমাকেই। কারন প্রেম শুরু করার জন্য ক্যটালিস্ট কিংবা এনজাইমের প্রয়োজন হয়। অসাহসী প্রেমিকরা নিজে নিজে প্রেম শুরু করতে পারেনা প্রভাবক ছাড়া। যদিও রাহাত অসাহসী নয়, তবু প্রেমের মুখোমুখি হওয়ার সময় ওর বুকটা হয়তো একটু কেঁপেই উঠেছিল।
(এখানে অসাহসী অর্থ হল সামান্য সাহসী, তবে কাপুরুষ নয়।)
সেদিন থেকে থিউরি পরীক্ষা শেষ। উদ্ভিদবিদ্যা (তত্বীয়) পরীক্ষা। ঠাকুরগাঁও সরকারী মহিলা কলেজে আমাদের পরীক্ষা হচ্ছিল। পরীক্ষা হলে ঢুকার সাথেই রাহাতকে বলে রাখলাম- দোস ১৫ মিনিট আগেই বের হব।
রাহাত বলল, ঠিক আছে।
সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য! সময় মাত্র ১৫মিনিট বাকি।আরো ১২ মার্কস বাকি। আমার সামনের জনের সাথে কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম। দ্বায়িত্বরত শিক্ষক আমার খাতা টেনে নিল। অগত্যা বের হয়ে চলে আসলাম।
ভাবলাম রাহাত ও বের হবে। নাহ, শালা লিখতেই আছে।
গেটে দাড়িয়ে আছি। তখনো কেউ বের হয়নি। হঠাৎ বের হয়ে আসল লামিয়া, অনুর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। বললাম, অনু কই?
-এইতো একটু পরেইই বের হবে। এই বলতেই বেরিয়ে আসল অনু।
-অনু দাড়া, কথা আছে।
-কি কথা?
-তুই আমার একটা জিনিস চুরি করেছিস।আমার ঠিক না, আমার এক বন্ধুর।
-কি জিনিস?কার?
-ওর মুখেই শুনিস, ও এক্ষুনি বের হয়ে আসবে।
ঘন্টা পড়ে গেল, রাহাতের বের হওয়ার কোন নামই নেই। আমি দাড়িয়ে আছি, সাথে অনু। একটা বিরক্তিকর দশ মিনিট সময় পার করার পর চলে আসল রাহাত। অনুকে বললাম- এই হল সেই ব্যক্তি, যার জিনিস তুই চুরি করেছিস। তোরা গল্প কর্ - এই বলে আমি সামনে হাটতে লাগলাম, ওরা দুজন আমার পিছনে।
ওদের গল্পগুলো আমি আধো আধো শুনতে পাচ্ছি। বেশিরভাগ প্রশ্ন রাহাতই করতেছে, আর অনু শুধু উত্তর দিচ্ছে। রাহাত যেন তার ভাইভা নিচ্ছে। নিজের তৈরী প্রেম ইন্ডাষ্ট্রিতে অনুকে চাকরি দিবে, বিষয়টা এমন। কেমন পরীক্ষা দিয়েছ, কোথায় কোচিং করবে, মোবাইল ফোন ব্যবহার কর কি না -এই টাইপের প্রশ্ন করছিল রাহাত। এভাবে কথা বলতে বলতে অনুর মেস পর্যন্ত চলে আসি। সেদিন এতটুকুই।
যাইহোক ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি থাকায় আরো ক'টা দিন দেখা করার সুযোগ হয়েছিল অনুর সাথে।আমার এই অসাহসী বন্ধুটা অবশেষে ঠাকুরগাঁও প্রস্থানের আগেই তার প্রেমকুমারীর মোবাইল নম্বরটা নিতে পেরেছিল।যদিও অনু বলেছিল- এটা আমার নম্বর না,এটা আমার ভাইয়ার নম্বর। অনু হয়তো মিথ্যা বলেছিল রাহাতকে এড়িয়ে চলার জন্য।
রাহাত আমাকে বলল- দোস্ত নম্বর তো নিলাম, কিন্তু মনের কথাটা বলি কেমনে?
আমি বললাম- দাড়া, হুট করে বলে দিলি, সে না করল, তখন কি করবি? তাই আগে ভাল একটা সম্পর্ক তৈরী কর, তার মনের অবস্থা নিজেই বুঝতে পারবি, তখন বলিস।
রাহাত কোচিং করার জন্য ঢাকা চলে গেল, আর অনু রংপুর। ফোনে কথা হচ্ছে নিয়মিত দুজনের। এভাবে কথা বলতে বলতে রাহাত একদিন বলে ফেলে- অনু আমি তোমাকে ভালবাসি।
অনু বলে- দেখ রাহাত, আমরা বন্ধু ছিলাম বন্ধু থাকি,এর মধ্যে প্রেম-ভালবাসা জিনিসটাকে আনতে যেওনা।ওসব আমার একদম ভাল লাগেনা। বাবা মা যার সাথে বিয়ে দিবে তাকেই বিয়ে করব।নিজে পছন্দ করে তাদেরকে কষ্ট দিতে চাইনা।
রাহাত একটুও আশাহত হলনা। ভাবল- এখন হয়তো রাজি হচ্ছে না, দুদিন পর ঠিকই রাজি হয়ে যাবে।
দুজনে আগের মতই কথা বলতেছে, যেন তারা কত জনমের বন্ধু। এমনভাবে ওরা কথা বলছে, যে কেউ খেয়াল করলে মনে করবে এরা প্রেম করছে। কিন্তু আসলে বিষয়টা তা নয়। পাখিকে আদরযত্ন দেয়া হয় ঠিকই, কিন্তু পাখি পোষ মানে না।
রাহাত মাঝে মাঝে রংপুর আসত পাখির সাথে দেখা করতে। পাখি আবার দেখা সাক্ষাত মুলক বন্ধুত্বপূর্ন আচরনে ঠিকই সারা দিত।
ওরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেও গিয়েছিল। বাদ যায়নি তাজহাট জমিদারবাড়ি, বাদ যায়নি সুরভি উদ্যান, রংপুর চিড়িয়াখানা, বাদ যায়নি হস্তকুটির শিল্পমেলা,বাদ যায়নি নাগরদোলা। রংপুরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, যেমন- মামুনি রেস্টুরেন্ট, বৈশাখী রেস্টুরেন্ট- এগুলোও মুখর ছিল তাদের দুজনের পদচারনায়। বার্থডে গিফট আদান-প্রদান এটাও বাদ যায়নি। তবে রাহাত কেন মেনে নিবে- অনু তারে ভালবাসে না? অবশ্যই বাসে, নাহলে এসব কি?
এভাবে চলতে চলতে তিনটি বছর কেটে গেল। নাহ, অনু তার সিদ্ধান্তে অটল। ভালবাসার পাখি পোষ মানলই না।
অনু একদিন রাহাত কে ফোন করে বলে- রাহাত, আমার বিয়ের কথা চলছে, আগামী সপ্তাহে আমাকে ওরা দেখতে আসবে। তুমি কি কিছু বলবে?
রাহাতের মুখে কথা সরেনা, রাহাতের বলার কিছু নেই, কারন রাহাতের বিয়ের এখনো সময় হয়নি। সে সবে মাত্র অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে।
কিছুদিন পর অনুকে রাহাত ফোন দেয়, ওপাশ থেকে যা শোনা যায় তা হল "এই মহুর্তে আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটিতে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না, অনুগ্রহ করে একটু পড়ে আবার ডায়াল করুন, ধন্যবাদ"।
অনুগ্রহ করে একটু পরে রাহাত ঠিকই ডায়াল করেছিল। কিন্তু রিং হয়নি কখোনোই।
রাহাত হয়তো প্রচন্ড আঘাত পেয়ছিল। তবু পুরুষ মানুষ বলে কথা। সবকিছুই স্বাভাবিক ভাবেই নিল রাহাত। তবে সঙ্গী হিসেবে একজনকে সে ঠিকই বেছে নিল আর সেটা হল- গোল্ডলিফ সিগারেট।
রাহাতের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হলে সে তার এই বেদনাভেজা গল্পগুলো শেয়ার করত। তার রুমমেট জুয়েল এসব শুনে তো চোখের জলই ছেড়ে দিত।তারপর জুয়েল একটা গামলা নিয়ে আসত, বাজানো শুরু করত আর আমরা তিনজনেই গান ধরতাম -"প্রেমেরই নাম বেদনা,সেকথা বুঝিনি আগে। দুটি প্রানের সাধনা কেন যে.......... "।
No comments:
Post a Comment