যবিপ্রবিতে (যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিবদ্যালয়) ক্যাম্পাস সংলগ্ন সড়কে প্রতিবছরই সড়ক দুর্ঘটনায় এপর্যন্ত নিহত হয় মোট পাঁচ শিক্ষার্থী। অথচ এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোন মাথাব্যথা নেই। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।
মুলঘটনা:
গত ১২ডিসেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন যশোর-চৌগাছা সড়কের পুলতাডাঙ্গায় গতকাল শুক্রবার ট্রাক ও নছিমনের সংঘর্ষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রসহ চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই ছাত্রীসহ ১৬ জন।
দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে বাধা দিলে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় চার ঘণ্টা ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু হানিফ (২২) এবং চৌগাছা উপজেলার আফরা গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান (২৮) ও খাদিজা বেগম (৪৫) এবং একই উপজেলার ফুলসরা গ্রামের খায়রুল ইসলাম (৪৮)।
নিহত ছাত্র হানিফের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুমারজানী গ্রামে। বাবার নাম রফিক মিয়া। হানিফ এ বছর জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ১১০ মিটার হার্ডলস দৌড়ে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শারমিন সুলতানা বিথী, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী বাসবি ভট্টাচার্যসহ ১৬ জনকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিছু ফেসবুক স্ট্যাটাসঃ-
স্ট্যাটাস-১:
আমাদের চোখের সামনে দিয়ে এক এক করে সাত সাতটা তাজা প্রান ঝরে গেছে। সামনের সিরিয়াল কার!!!!!! এই প্রশ্ন আমাদের মনে জাগাটা খুবই স্বাভাবিক। এটা যে কেউ হতে পারে। মৃত্যু যে কারো যখন তখন হতে পারে, তবে এই মৃত্যু কারো কাম্য নয়। এই মৃত্যুকে এড়ানো অনেকখানি সম্ভব ছিল আমাদের জন্য। আমরা সেশন জটের ভয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভয়ে, রেজাল্ট খারাপের ভয়ে কেউ কোন কাজের কথা বললে, আন্দোলনের কথা বললে সামনে যায় না। যদি পৃথিবীতে বাঁচতেই না পারলাম যদি হানিফের পরের সিরিয়ালটা আমার চলে আসে তবে কি হবে এই পড়াশুনা, এই বিশাল বিশাল রেজাল্ট দিয়ে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। বাস এর ঘাটতি খুব বেশী আছে বলে আমার মনে হয় না তবে ঘাটতি রয়ে গেছে ওই প্রশাসনের বড় বড় চেয়ারে বসা মানুষগুলোর মন মানসিকতার। তারা কি আমাদের ক্ষোভ কিছুই জানেন না? তারা কি কিছুই দেখেন না? তাদের সামনেই তোঁ এতগুলো ছাত্রছাত্রী মারা গেলো, তাদের কি একটুও দয়া হয় না? ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজন কিছু নাই তাদের? তারা ছাত্রদের দুর্বলতা নিয়ে হাসি তামাশা করেন। তারা মিনিটে মিনিটে রেজাল্ট, সার্টিফিকেট এর ভয় দেখান। তারা কি পারতেন না পরিবহন সুবিধা একটু বাড়াতে? ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয় মানুষ হওয়ার শ্রেষ্ঠ স্থান। আমাদের যারা মানুষ করবেন তারা যদি আমাদের সাথে অমানুষের মত আচরণ করেন তবে আমরা কি শিখবো?
স্ট্যাটাস-২:
গুরুতর আহত শিক্ষার্থী বিথী কে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়নি । বিথীকে যশোর সেনাবাহিনীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত CMH হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল । ভিসি এর গড়িমসি আর দ্রুত টাকা জমা না দিয়ার কারনে আহত শিক্ষার্থী বিথীকে CMH হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল । প্রথমে হেলিকাপ্টার যোগে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তাকে এয়ার এম্বুলেঞ্চে করে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করা হয় । এই দিকে যশোর সদর হাসপাতাল এ তার অবস্তা করুন হতে থাকে । যশোর সদর হাসপাতাল এ অক্সিজেন এর অভাব, নার্সরা দায়িত্বহীন থাকার কারনে সেই সময়ে উপস্থিত থাকা শাহারিয়ার, অয়ন, ফারুক, অন্তরদের এর চাপ এর মুখে পরে হাসপাতাল এর ভিতরে তার সেবা সরবরাহের চেষ্টা করা হয় । পরে হাসপাতালে রক্তক্ষরণ আর বমি বেশি হতে থাকলে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতায় বিথীকে দ্রুত যশোর CMH হাসপাতালে নেয়া হলে কিছুটা আশঙ্কামুক্ত হওয়া যায় । আহত শিক্ষার্থী বিথী এখন CMH হাসপাতালে আছে । বিথী এখন আশঙ্কামুক্ত চিকিৎসকরা এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদি যশোর সদর হাসপাতাল এ বেশি কিছুখন থাকত তাহলে তাকে হইত আমরা পেতাম না । আমাদের ভিসি স্যার আর কথা মতো যদি ফরিদপুর হয়ে লঞ্চ পার হয়ে এম্বুলেঞ্চে করে ঢাকা যেত তাহলে এতক্ষণে কি হতো জানি না । আমাদের ভিসি স্যার কোটি কোটি টাকার বাজেট নিয়ে আসছেন ভার্সিটিতে ,,আশেপাশের সকল এমপি-মন্ত্রি তার কত পরিচিত, তার এক কথায় প্রশাসন চুপ হয়ে যায় , আথচ সামান্য দুই লক্ষ টাকা তিনি সেই সময় জোগাড় করতে পারলেন না । এইটা আমাদের কাছে অতান্তই দুঃখ জনক ।।।
স্ট্যাটাস-৩:
যবিপ্রবি ছাত্র নিহতের
প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ
এবার বিচার না হওয়ার এক সেকেন্ড আগেও
ঘরে ফিরা হবে না,বার বার স্টুডেন্ট
মারা যাবে গাড়ি এক্সিডেন্ট এ আর তার
কোন বিচার হবে না তা এবার আর হবে না।
আমাদের এক ভাই মারা গেছে ১ বোনের
অবস্থা খুব খারাপ আরো কয়জন গুরুতুরু আহত এই
শোকেই আমরা কাতর তারপরেও আমাদের উপর
গ্রামবাসীর আক্রমণ, আমাদের কি দোষ?
আমার ভাই,বোন
মারা যাবে আমরা কাঁদতে পারবো না?
যবিপ্রবিতে পড়াশোনা করাই কি আমাদের
দোষ?? সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই এর
বিচার চাই তদন্ত কমিটি গঠন পর্যন্তই যেন শেষ
না হয়।
স্ট্যাটাস-৪:
কাঁদো ইলিয়াস কাঞ্চন কাঁদো
নিরাপদ সড়ক পেয়েছ কি?
,,,,,,আমরা যে শোকে মুহ্যমান।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
শেষকথা:
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে কেন এত দুর্ঘটনা ঘটে? জানতে চাইলে উপাচার্য আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে জানান, যশোর-চৌগাছা সড়কটি অত্যন্ত সরু। তা ছাড়া এ সড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল বেশি। যে কারণে সড়কটি চলাচলে একদমই নিরাপদ নয়।
উপাচার্য আরও বলেন, ‘এ সড়কে যাতে বৈধ ও ভালোমানের যানবাহন চলাচল করে সে জন্য আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের সিন্ডিকেটের কারণে এটি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আশরাফুজ্জামান জাহিদ জানান, সড়ক দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে: সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহর পর্যন্ত বিশেষ বাসের ব্যবস্থা, নছিমন-করিমনসহ অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয়নি।
No comments:
Post a Comment